Blogs

শরৎ_সুন্দরী

  গাড়ির কাঁচটা হাল্কা নামিয়ে নিলো কুহু.. আজ সানগ্লাসটা চোখ ঢাকুক অন্তরালে । কলকাতাকে বাইশ ঘন্টা আগে পুরোপুরি বিদায় জানিয়ে এসছে সে । সাদা পেজা তুলোয় স্নিগ্ধ শরৎ আজ পুষ্প সজ্জিত এক মুঠো রঙের ঝংকারে ।। আলো ফুটেছে গাছে,মার্কিণী শহর মাতছে উৎসবে ।। স্টিয়ারিং এ অর্চি,সতর্ক নজর সামনের রাস্তায় । গন্ত্বব্যে ভুলের কোনো জায়গা নেই... আর কয়েকটা দিন পেরোলেই কুহুর আর নিঃশ্বাস ফেলার জো থাকবে না । লেখা,নাচ তো আছেই,আছে পুজোর কাজ।এক বছর বিয়ে হওয়ার ঠিক পরেই তার সংসার সাগরপারে..খোদ নিউ জার্সিতে তার সাজের খুব চর্চা (চোখ টাটানোও আছে যদিও ) কুহুর মনটা চলে গেলো ফেলে আসা দেবীপক্ষে ।। পাঁচদিনে দশটা জামা,বাবা নিয়ে যেতো নিউ মার্কেট ! প্যান্ডেল বাঁধার গন্ধ ঠিক ততোটাই কুহুর ভালো লাগতো যতটা লাগতো আনন্দমেলার ঘ্রাণ..লুকিয়ে একটু লিপস্টিক,আনকোরা হাতে শাড়ি সামলে,দে ছুট অষ্টমীর অঞ্জলিতে,দেরী হলেই কুশের পাশে ঐন্দ্রিলা দাড়িয়ে পড়বে ! হ্যা,কুশ!!সেই স্কুল থেকে বেষ্ট ফ্রেন্ড কথাটার মানে বুঝতে শেখা ওর থেকেই । স্কুলের গন্ডি পেরোতেই,ভয় পাওয়া ইচ্ছেগুলো বোঝাতে চাইতো প্রথম এবং শেষ প্রেম তুই । কিন্ত “ও কেনো আগে বলছে না” এই দ্বন্ধে কেটে গেলো কলেজ লাইফ । হয়তো সারাক্ষণ একসাথে থাকার ফলে বড্ড বেশী নিশ্চিত হয়ে গেছিলো পরস্পরের উপস্তিথি । সেবার সদ্য পরিণীতা কুহু ... কলেজ শেষ করে সে এখন ইংরেজী নিয়ে মাস্টার্ষ করছে,উজ্জ্বল শ্যমবর্ণা,তন্বী,কাজলনয়না,সুডৌল কোমরে অনেকেই ধরাশায়ী , কিন্ত মেয়ে সেই পাগল একজনের জন্য,ছন্নছাড়া,কবিতা লেখা,আর দেশ-বিদেশে গান গেয়ে বেড়ানো কুশের জন্য ।। “ও দুগগা মা,তুমি তো সব জানো”!সেই ঐন্দ্রিলার সাথে দাড়িয়ে কুশ।চোখে জল আসতেই হঠাৎ,“সন্ধ্যেবেলা আমার বাড়ি আসিস,বুঝলি পাগলি”!! কুহু সেই প্রথম দেখেছিলো বাড়ির পুজো,আটচালার লাল থামে “মুখার্জী” ।এই বাড়িতেই কি তবে....... সম্বিত ফিরলো স্পর্শে! আলতো হাতের অকারণ ছোঁয়ায় কুশের ভরসা,নাকি বাঁধভাঙার আহ্বান।। কুহুর ধুনুচি নাচে সেদিন উদ্দাম মদিরতা ! “মা তুমি যেওনা বিসর্জন” ।। মা তুমি থাকো ম্যাডক্সের বন্ধুত্বে,প্রথম সিগারেটের টানে,ফুচকায়,বাবা মার বকুনিতে,কিশোরের গানে,দেদার প্যান্ডেল হপিং এ,মা তুমি থাকো নির্ঝঞ্জাট সম্মোহনের আমন্ত্রণে,তুমি থাকো বিসর্জনের ঢাকে,আলতা-সিঁদুরে ।। কিন্ত হঠাৎ !!!! হঠাৎ... সব অন্ধকার হয়ে গেছিলো সেদিন । গঙ্গা-স্নান করে বাড়ি ফেরার সময় মারা যান কুশের মা বাবা !! এক নিমেষে হারিয়ে গেছিলো কৃষ্নচুড়ার আলো, শুন্য হয়ে গেছিলো ছায়াপথ । বিষন্ন ব্যলকনিতে জোনাকিদেরও মন খারাপ বুঝি আজ.... মা দুগ্গা কি এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে... কি করবে কুহু এখন !! কুহু কি হারিয়ে ফেলছে রাস্তা ! ঘাটকাজ করে ফেরার পর কুশকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলো “আমি আছি,চল বিয়ে করেনি”..না কোনও কুন্ঠাবোধ কাজ করেনি । মুহুর্ত চুপ.. ঠোঁটের তুরুপে রঙ্গীন আদর , এই প্রথমবার বাধ ভাঙলো..। স্বেচছায় বশ্যতা স্বীকার করে আবেদনের গোপণ মিনার, ঠোঁটের ভিতরে উষ্ন পরাগ, রাতের শরীর ঘুমের আদর, নরম গভীরতা.. পরিপূর্ণতা পায় প্রতিশ্রুতি.. সকাল হচ্ছে... ফাগুণ সিক্ত কুশকে কাছে টেনে নেবে বলে হাত বাড়াতেই...একা একটা চিঠি-“আমার ঘেন্না হয় জীবনকে,চাই না আমি,ভালো থাকা”..... হুঁশ ফিরলো অর্চির ডাকে,”ওই সামনের সিটে ঘুমিও না”!! হুমম্,সানগ্লাসটা ঠিক করে নিলো কুহু,কবে যে আনন্দমেলা থেকে দেশ এ পৌছে গেলো।। অনেক চেষ্টা করেছিলো কুহু যোগাযোগ করার । চায়না কুশ... তাই অভিমানী কুহু বলেনি,জীবন জন্ম নিচ্ছিলো তার ভেতরে । যে জীবন এনে দিতে পারতো প্রাণ ভরে নিশ্বাস নেওয়ার একটা সুযোগ... হৃদয়ের জন্ম যে অবৈধ,বিসর্জন রক্তক্ষরণে । বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ একটা চেনা নম্বর দেখায় ট্রু-কলার । “কুহু একবার আসতে পারবি”? তাই,এই কলকাতায় যাওয়া কুহুর, এটা দেখাতে,ইচ্ছে থাকলে পথে দেরী হয় না । স্বযত্নে রাখা ইউ-এস-জি রিপোর্টটা দেখাতে কুশকে । “হ্যা এটুকুই বলার ছিলো তোকে”... পুড়িয়ে দিতে সব অনুভূতি, ভালো না থাকলেও প্রতিশ্রুতি ভাঙবে না কুহু ।। না আজ আর ছাতিম ফুলের গন্ধে কবিতারা আসে না, আসে না চোখ বুজে মাথা রেখে শান্ত হওয়ার রাত, স্লিপিং পিল আজ বেষ্ট ফ্রেন্ড,ওরা যে কখনও পলাতক হবে না। সময়টা কেটে গেছিলো নীরবতা পালনের দায়ে... দু সপ্তাহে কলকাতাকে বিদায় জানিয়েছিলো কুহু ..... অর্চি কে ভালোবাসতে পারেনা । কিন্ত ভালোলাগাতে শিখছে কুহু ।। এখন পুজোয় কাশফুলের সমগোত্রীয় খোঁজ,আছে পুজোর ম্যাগাজিনে নিজের নাম,এসোসিয়েসনের স্টাইল আইকন হওয়ার তকমা.. শাসনের বেঁড়াজালে অর্চিকে হারানার ভয় আজ নেই!! আছে প্রাণপ্রণে “আমি বাঙালি” প্রমাণ করার তাগিদ !!! দীর্ঘনিশ্বাসে কুহুর হাসি পেলো.... নাগরিক নিস্তব্ধতার দায়,হায়রে বাঙালি!! হঠাৎ শরতের রঙ লাল,”আরে আমি অষ্টমিতে ছুটি নেবো পাগলি”,ধক করে ওঠে বুকটা ।। পাগলিটা কবে ভেঙ্গেচুরে গেছে যে!! কিন্ত অর্চি যে কি করে জেনে গেলো,তার এই অধরা পাগলিটা এখনও বিসর্জনে কাঁদে..ভালোবাসা ভালো থেকো! খানা-খন্দের থিম পুজো না থাকুক,হৃদয়ের রঙ শরৎ,তাই এবারো পুজো হৈ-হুল্লোড়ের পাঁচালি।সাবেকি,প্রলেপহীন,কুহুর মা দুর্গা ।।আভিজাত্যে আড়ম্বরে নিশ্বাস নিক বাঙালি।।কুহু অর্চিরা শঙ্খধ্বনিতে দেবীপক্ষের  আয়োজনে প্রস্তুত ।। হ্যা নবপ্রেরণায় যন্ত্রনাকে হার মানাতেই হবে । জরাজীর্ণ কাঠামোই ধরে রাখে মহামায়ার নিখুঁত অবয়ব ।। এক মুঠো শরতের মেঘবালিকা কুহু, সিঁদুররাঙা মুখে বাঁচার লড়াই লড়তেই হবে অর্চিকে নিয়ে ।। আসছে বছর কোলে এসো মা ...... হোক পুজো ।।   Susmita Roychowdhury    

Events Calender


Find us on Facebook

Recent Tweets

Join the conversation